সাম্প্রতিক সংবাদ

ওসমানীনগরে পুত্রকে কাছে পেতে বৃদ্ধ মায়ের আহাজারি: সন্ত্রাসীদের তান্ডবে নিঃস্ব পরিবার

প্রকাশিত: ১২:০২ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০২১

ওসমানীনগরে পুত্রকে কাছে পেতে বৃদ্ধ মায়ের আহাজারি: সন্ত্রাসীদের তান্ডবে নিঃস্ব পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক :: প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের শেল্টারে সন্ত্রাসীদের একের পর এক নির্যাতনে সিলেটের ওসমানীনগরে দিশেহারা হয়ে উঠেছে এক প্রবাসী পরিবার। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে অপহরণের স্বীকার হওয়ার পর মুক্তিপণের মাধ্যমে উদ্ধার হয়ে জীবন বাঁচাতে প্রবাসে গিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করলেও সন্ত্রাসীদের নির্যাতন অব্যাহত থাকায় দেশে আসতে সাহস পাচ্ছেন না। সম্প্রতি প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের উপস্থিতিতে প্রবাসীর পৈত্রিক সম্পত্তি জোড়পূর্বক দখল নিয়েছে সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসীদের এসব কার্যকলাপ স্থানীয় থানা পুলিশকে বার বার অবগত করে গেলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। উল্টো থানা পুলিশ সন্ত্রাসীদের পক্ষাবলম্বন করে প্রবাসীর দেশে অবস্থানরত বৃদ্ধ মা-বাবাসহ আত্বীয়-স্বজনদের নানানরকম রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা ও হুমকি অব্যাহত রেখেছে। নিরুপায় হয়ে এ বিষয়ে অবশেষে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নের তাজপুর গ্রামের আছমত উল্যা ওরফে কাঁচা মিয়ার পুত্র প্রবাসী আব্দুল হকের বৃদ্ধা মা হনুফা বিবি। অভিযোগে তিনি নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ পুত্র আব্দুল হককে ফিরে পেতে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দখলকৃত জায়গা উদ্ধারসহ সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

জানা যায়, উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নের তাজপুর গ্রামের আছমত উল্যা ওরফে কাঁচা মিয়ার ছেলে আব্দুল হক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র অঙ্গসংগঠন উপজেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি থাকার সুবাদে সিলেট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের পর থেকে রোষানলে পরেন স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের। তারা আব্দুল হককে নাজেহাল করতে একের পর এক মিথ্যা মামলা ও হামলা চালিয়ে পারিবারিক সম্পত্তি দখলের পায়তারা চালায়। বছর তিনএক পূর্বে আওয়ামী লীগের পদধারী নেতারা আব্দুল হককে অপহরণ করে নিয়ে যায়। দুদিন পর মুক্তিপণের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে উদ্ধার হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও পুলিশ তা আমলে নেয়নি।

এরই ধারাবাহিকতায় নতুন বাজারে থাকা জায়গাটি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জোরপূর্বক দখল নিয়ে যায় আওয়ামী লীগের পদধারী নেতারা। আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক জায়গা দখলের লিখিত অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে পুলিশ অভিযোগ নিতে অপারগতা প্রকাশ করে। তাৎক্ষণিক আব্দুল হক বাদি হয়ে ২০১৭ সালে আদালতে জায়গা দখলের মামলা দায়ের করেন। মামলায় উপজেলার নতুন বাজার এলাকার খাতুপুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দুল ইসলাম ও তাজপুর গ্রামের আলী হোসেন গংদের অভিযুক্ত করা হয়। মামলা দায়েরের পর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে। আব্দুল হকসহ তার পরিবারের লোকজনের ওপর বিভিন্নভাবে নির্যাতনসহ গুম খুনের ভয় দেখায়। তাদের তান্ডবে জীবন বাঁচাতে এক পর্যায়ে বৃদ্ধ মা-বাবাকে বাড়িতে রেখে স্ত্রী সন্তান নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমান আব্দুল হক। আব্দুল হক প্রবাসে যাওয়ার পর দায়েরকৃত মামলায় দীর্ঘ স্বাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে ২০১৯ সালের ১২ অক্টোবর সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল হকের পক্ষে রায় প্রদান করেন এবং আব্দুল হকের দখল হওয়া জায়গা ফিরে পেতে থানা পুলিশকে সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন। কিন্তু আদালত কর্তৃক রায় পাওয়ার পরও সরকার দলীয় আওয়ামী নেতাদের হুমকি-ধামকির কারনে এখনো জায়গাটি ফেরত পায়নি পরিবারটি। এদিকে এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ডাকযোগে চিঠির মাধ্যমে আব্দুল হকের পরিবারের কাছে বড় অংকের চাঁদা দাবি করে। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ দেয়ার পর পুলিশ তাৎক্ষনিক সন্ত্রাসী আলী হোসেনকে আটক করলেও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে আটককৃতকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনে ও পুলিশকে ম্যানেজ করে বিষয়টি একতরফাভাবে নিষ্পত্তি করে।

এরই ধারবাহিকতায় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সমন্বয়ে গোলাপগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত একটি রাজনৈতিক মামলায় প্রবাসীর দেশে অবস্থানরত ভাগ্নে সুমন মিয়াকে এজাহারভুক্ত আসামী করা হয়। এ বিষয়ে অভিযোগকারী বৃদ্ধা তার স্বামীকে নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতাউর রহমান ও তৎকালিন সাধারণ সম্পাদক আবদাল মিয়া ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আনা মিয়ার সরনাপন্ন হলেও কোনো কাজ হয়নি। উল্টো আওয়ামী লীগ নেতারা বৃদ্ধদের বলেন, তোমাদের পুত্র আব্দুল হককে দেশে নিয়ে এসে এবং দেশে অবস্থানরত নাতি সুমনকে আওয়ামী লীগে যোগদান করিয়ে নেন। তা না হলে তোমাদের পরিবারের কেউ শান্তিতে থাকতে পারবে না। সুমন ফেরারি হয়ে দেশে দেশে ঘুরবে আর আব্দুল হক দেশে আসলে সন্ত্রাসীদের হাতে জীবন দিতে হবে। এসব কথায় রাজি না হওয়ায় গালিগালাজ করে বৃদ্ধাদের অফিস থেকে বের করে দেন আওয়ামী লীগ নেতারা বলেও অভিযোগ করেন আব্দুল হকের মা। পরবর্তীতে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আবারও আব্দুল হকের বাড়িতে হামলা চালায় এবং নির্যাতন করে বৃদ্ধ মা-বাবাকে। এ বিষয়ে থানায় দেয়া অভিযোগ পুলিশ আমলে না নিয়ে সিলেটে ভিন্ন আরো একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলায় আব্দুল হকের বৃদ্ধ পিতাকে আসামী করে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
চলতি বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দুল, এপ্যাল ও আলী হোসেনের নেতৃত্বে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতারা কাঁচা মিয়ার বাড়িতে গিয়ে আব্দুল হক দেশে ফিরলে হত্যার হুমকি প্রদান করে ও ভাগ্নে সুমন মিয়ার সন্ধান দাবি করে। এসময় সন্ত্রাসীরা সুমনকে না পেয়ে গালিগালাজ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে স্থানীয় নতুন বাজারে থাকা আব্দুল হকের নামীয় জায়গায় জোড়পূর্বক ঘর নির্মান করে ব্যবসা পরিচালনা শুরু করে। এসব বিষয়ে আব্দুল হক দেশে অবস্থানরত বৃদ্ধ পিতা-মাতাসহ আত্বীয়-স্বজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রবাসে থেকে আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দুল ইসলাম সৈয়দ, যুবলীগ নেতা মুহিবুর রহমান ও আলী হোসেনকে অভিযুক্ত করে প্রবাসী কল্যাণ সেলে লিখিতভাবে একাধিক অভিযোগ প্রেরণ করলেও কোনো কাজ হয়নি।

বৃদ্ধ হনুফা বিবি কান্নাজনিত কন্ঠে বলেন, পুত্র আবুল হকের যুবদলের রাজনীতি করাটাই পরিবারের জন্য কাল হয়ে দাড়িয়েছে। পরিবার হয়েছে নিঃস্ব। ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডাররা প্রতিনিয়ত হামলা ও নির্যাতন করে যাচ্ছে। দখলকৃত জায়গাসহ প্রবাসে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপনকারী পুত্র আব্দুল হককে ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রীসহ প্রশাসনের উধর্¦র্তন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দুল ইসলাম সৈয়দ বলেন, ওদের সাথে ব্যাক্তিগত কোনো বিরোধ নেই। আব্দুল হক ও তার ভাগ্নে সুমন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিভিন্ন নাশকতার সাথে লিপ্ত থাকায় সিনিয়র নেতাদের পরামর্শে আমরা প্রতিহত করার চেষ্ঠা করেছি। জোরপূর্বক জায়গা দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে কোনা উত্তর না দিয়ে সৈয়দুল ইসলাম রাগান্বিত হয়ে প্রতিবেদককে হুমকি দেন।

সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন সার্বিক বিষয়ে আব্দুল হক ও তার বৃদ্ধা মায়ের দাখিলকৃত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যে কেউ যেকোনো দল সমর্থন করতে পারে। বিষয়টি তদন্তাধিন সত্যতা পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ